পাবনার মরমি কবি বন্দে আলী মিয়ার আজ মৃত্যুবার্ষিকী


‘আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ।
মাঠভরা ধান আর জলভরা দিঘি,
চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি।
আমগাছ জামগাছ বাঁশঝাড় যেন,
মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন।’

‘আমাদের ছোট গায়ে ছোট ছোট ঘর
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর্।
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই
একসাথে খেলি আর পাঠশালায় যাই।
হিংসা ও মারামারি কভু নাহি করি
পিতামাতা গুরুজনে সাদা মোরা ভরি।
আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাচাইছে প্রাণ।
মাঠ ভরা ধান আর জল ভরা দিঘী
চাদর কিরন লেগে করে ঝিকিমিকি।
আম গাছ জাম গাছ বাশঝাড় যেন
মিলে মিশে আছে ওরা আত্তিয় হেন।
সকালে সোনার রবি পুব দিকে
পাখি ডাকে বায়ু বয় নানা ফুল ফুটে।’

বিখ্যাত এরকম অসংখ্য ছড়া-কবিতাটির রচয়িতা, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রকর মরমি কবি বন্দে আলী মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

পাবনার কৃতিসন্তান প্রখ্যাত এই শিশুসাহিত্যিক ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন রাজশাহীর কাজিরহাটে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

তিনি ১৯০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পাবনা জেলার রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম উমেদ আলী মিয়া এবং মায়ের নাম নেকজান নেছা। কবির শৈশব আর কৈশোর কাটে রাধানগরেই।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে কবি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন পাবনার রাধানগর মজুমদার (আরএম) একাডেমি থেকে। এরপর ভর্তি হন কলকাতা আর্ট একাডেমিতে। ১৯২৭ সালে সেখান থেকে চিত্রকলায় ১ম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

বন্দে আলী মিয়া তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন পড়াশোনা শেষ করার আগেই। সাংবাদিক হিসেবে ১৯২৫ সালে তিনি ইসলাম দর্শন পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। পরে, ১৯৩০ সালে যোগ দেন কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে, সহকারী শিক্ষক হিসেবে। এখানে দীর্ঘ ২০ বছর চাকরি করে ১৯৫০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ষাটের দশকে প্রথমে ঢাকা বেতারে ও পরে রাজশাহী বেতারে চাকরি করেন। পাশাপাশি কবি বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানির জন্য পালাগান ও নাটিকাও রচনা করেন। সেগুলো রেকর্ড আকারে বের হলে বেশ জনপ্রিয়ও হয়।

তিনি ছোটদের ‘গল্পদাদু’ নামে খ্যাত। শিশুতোষ ছড়া ও গান রচনায় বন্দে আলী মিয়া বিশেষ অবদান রেখেছেন। এছাড়া তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, গীতিকার, উপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী। কবির প্রথম কাব্য ‘ময়নামতির চর’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বেশ প্রশংসা পায়।

২৬ বছর বয়সেই সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি পান বন্দে আলী মিয়া। তার শিশুতোষ গ্রন্থ ১০৫টি ও অন্যান্য বিষয়ে লেখা গ্রন্থ ৩১টি।

তার সাহিত্যক্ষেত্রের বিচরণই শুধু এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল না, বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল তার পেশাগত জীবনও। তিনি শিক্ষকতা করেছেন, বেতারে কাজ করেছেন এমনকি নাটকেও কাজ করেছেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক হিসেবে।

ছোটদের জন্য পাঁচটা-দশটা নয়, মোট বইয়ের সংখ্যা ১০৫। আর সে সময়ে ছোটদের জন্য লেখা তার ছড়া-কবিতাগুলো এখনও জনপ্রিয়।

বন্দে আলী মিয়া সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ’র মতো বই লিখেছেন। যার মধ্যে ১০৫টি বই-ই ছোটদের জন্য। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে- ‘ময়নামতির চর’, ‘অরণ্য’, ‘গোধূলী’, ‘ঝড়ের সংকেত’, ‘নীড়ভ্রষ্ট’, ‘জীবনের দিনগুলো’, ‘অনুরাগ’।

আর ছোটদের জন্য লেখা বইগুলোর মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল চোর জামাই, মেঘকুমারী,  মৃগপরী, বোকা জামাই, কামাল আতাতুর্ক, ডাইনি বউ, রূপকথা, কুঁচবরণ কন্যা, ছোটদের নজরুল, শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা ইত্যাদি।

বন্দে আলী মিয়া সাহিত্যকীর্তির জন্য ১৯৬২ সালে পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ১৯৬৫ সালে পান প্রেসিডেন্ট পদক। মৃত্যুর পরও তিনি পেয়েছেন দুটো মরণোত্তর পদক। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৮ সালে একুশে পদক, ১৯৯০ সালে স্বাধীনতা পদক।